লাইব্রেরিয়ানদের যে পদে নিয়োগ সে পদেই অবসর
লাইব্রেরিয়ানদের যে পদে নিয়োগ সে পদেই অবসর
বিএম জাহাঙ্গীর
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট, ২০১৩( দৈনিক যুগান্তর)
পদোন্নতির সুযোগ রেখে সমন্বিত নিয়োগবিধি প্রণয়নসহ ক্যাডার সার্ভিসের আওতায় আনার দাবিতে ঈদের পর কঠোর আন্দোলনে যাচ্ছে লাইব্রেরিয়ান কর্মকর্তা সমিতি বা বাংলাদেশ গ্রন্থাগারিক ও তথ্যায়নবিদ সমিতি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে চাকরিতে যোগ দিয়েও দেশের বেশিরভাগ লাইব্রেরিয়ানের কোনো পদোন্নতি নেই। এ নিয়ে বিগত দুই যুগের বেশি সময় ধরে প্রতিটি সরকারের কাছে দাবি জানানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ জন্য এবার তারা সত্যিকারার্থে দাবি আদায়ের কার্যকর আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জানা গেছে, যে পদে নিয়োগ সেই পদেই অবসর এভাবে চলছে লাইব্রেরিয়ান পদে চাকরি। বিশ্ববিদ্যালয়সহ দুএকটি প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরিয়ানদের কালেভদ্রে পদোন্নতি হয়। কিন্তু ৯৯ ভাগ লাইব্রেরিয়ান পদে কোনো পদোন্নতি নেই। অথচ লাইব্রেরিয়ান পদটি প্রথম শ্রেণীর পদ। এ পদে যোগ দেয়া কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাইব্রেরি সায়েন্সে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন। তাদের মধ্যে যারা বিসিএস দিয়ে ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দিয়েছেন তারা তর তর করে পদোন্নতি পেয়ে উপরে উঠে গেছেন। কিন্তু যারা পড়াশোনা করা বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে লাইব্রেরিয়ান পদে চাকরি নিয়েছেন তাদের কপাল পুড়েছে। ভুক্তভোগী একজন লাইব্রেরিয়ান যুগান্তরকে বলেন, ২৭ বছর চাকরি করেও তার ভাগ্যে কোনো পদোন্নতি জোটেনি। অথচ একসঙ্গে লাইব্রেরি সায়েন্স নিয়ে পাস করা তার অপর এক সহপাঠী বিসিএস দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি নিয়ে এখন সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন।
সূত্র জানায়, এ রকম বৈষম্য আর বঞ্চনার কারণে ব্লক পদে থাকা পদোন্নতি বঞ্চিত ছয় শতাধিক লাইব্রেরিয়ানের ক্ষোভ অসন্তোষের শেষ নেই। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ন্যায় অন্তত ২০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে লাইব্রেরিয়ান পদ রয়েছে। কিন্তু তাদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পদোন্নতির দাবিতে তারা বহুবার জনপ্রশাসন সচিবসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায়ে দেখা সাক্ষাৎ করেছেন, দিয়েছেন লিখিত আবেদন ও প্রস্তাবিত দাবিনামা। যেভাবে পদোন্নতি দেয়ার সুযোগ আছে তাও তথ্যউপাত্ত দিয়ে তুলে ধরেছেন। কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছেন শুধুই আশ্বাস। এর মধ্যে গত ৯ এপ্রিল এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে ডিও লেটার দিলে কিছুদিন ফাইলের নড়াচড়া শুরু হয়। এরপর তা আবার তিথিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের লাইব্রেরিয়ান শামীমা আক্তার চৌধুরী ও আইন মন্ত্রণালয়ের লাইব্রেরিয়ান এএম হান্নান যুগান্তরকে বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা থেকে তাদের ফাইলটি গত মে মাসে এক রকম হারিয়ে যায়। বারবার চেষ্টা-তদবির করার পর ফাইলটির হদিস মেলে। ফাইলটি এখন মন্ত্রণালয়ের কল্যাণ শাখায় পড়ে আছে। কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। তারা বলেন, তাদের চোখের সামনে সবাই পদোন্নতি পেয়ে যাচ্ছেন। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেও তারা ব্লক পদে পড়ে আছেন। বছরের পর বছর একই পদে পড়ে থাকায় তারা কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে সচিবালয় লাইব্রেরিয়ান সমিতির এই দুজন শীর্ষ নেতা যুগান্তরকে বলেন, অবশ্যই তাদের পদোন্নতি দেয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকার তাদের লাইব্রেরিয়ান পদটিকে সহকারী সচিবের পদমর্যাদা দিতে পারে। একই সঙ্গে এই পদ থেকে সিনিয়র লাইব্রেরিয়ান বা সিনিয়র সহকারী সচিব, উপপ্রধান লাইব্রেরিয়ান বা উপসচিব এবং যুগ্ম প্রধান লাইব্রেরিয়ান বা যুগ্মসচিব পদমর্যাদায় পদোন্নতি দিতে পারে। এভাবে তারা একটি দাবিনামাও জমা দিয়েছেন। তারা বলেন, প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামোতে লাইব্রেরিয়ান পদ সৃষ্টি করে লোক নিয়োগ করার কারণে এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ প্রয়োজন ছিল একটি সমন্বিত নিয়োগবিধি বা সচিবালয়ের জন্য সচিবালয় নিয়োগবিধিতে এই পদ অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু তাও করা হয়নি। তারা বলেন, চোখের সামনে যে অফিস পিওন ও অফিস সহকারীদের তারা চাকরিতে যোগ দিতে দেখেছেন তাদের অনেকে এখন পদোন্নতি পেয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হয়ে গেছেন। এমনকি কেউ কেউ সহকারী সচিব (নন-ক্যাডার) পদেও পদোন্নতি পেয়েছেন। কিন্তু তাদের কোনো উন্নতি হয়নি। তারা ২৭ বছর আগে যে পদে চাকরি শুরু করেছিলেন সেখানেই পড়ে আছেন।
এদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ গ্রন্থাগারিক তথ্যায়নবিদ সমিতির চেয়ারম্যান ও গাজীপুরস্থ ইসলামী ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির লাইব্রেরিয়ান ড. মির্জা রেজাউল করিম যুগান্তরকে বলেন, অপেক্ষার পালা অনেক হয়েছে। আর না। এবার দাবি আদায়ে সত্যিই তারা মাঠে নামবেন। কেননা, পিঠ তাদের অনেক আগেই দেয়ালে ঠেকে গেছে। তিনি বলেন, ঈদের পর দুই দফা দাবিতে তারা আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
এর মধ্যে প্রথম দফা দাবি হল সারাদেশের লাইব্রেরিয়ানদের জন্য পদোন্নতির সমান সুযোগ রেখে সমন্বিত নিয়োগবিধি প্রণয়ন এবং দ্বিতীয় দফা দাবি হিসেবে লাইব্রেরি নামে পৃথক ক্যাডার সৃষ্টি করতে হবে। এর আগে তারা প্রতিনিধি সম্মেলন করবেন। তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে লাইব্রেরিয়ানদের কিছু পদ ক্যাডার হিসেবে রয়েছে। এ ছাড়া অবশিষ্ট লাইব্রেরিয়ান পদে পদোন্নতির সুযোগ রেখে পৃথক নিয়োগবিধি করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুই যুগ ধরে তারা শুধু দাবিই দিয়ে আসছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান ছাড়াও তারা দেখা করে তাদের দাবির কথা জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো ফল হয়নি।
সংবাদ ( সংগৃহীত)

Comments
Post a Comment